শিল্প পুলিশের আওতাধীন ৮ অঞ্চল

ঈদে বেতন-বোনাস দিতে সম্ভাব্য অসমর্থ কারখানার সংখ্যা ২৬৬

প্রতি বছর দুই ঈদ উদযাপনের আগে দেশের শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়ে কম-বেশি অস্থিরতা দেখা দেয়।

গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিল্প এলাকাগুলোয় অসন্তোষের ঝুঁকি অন্যবারের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। গত দেড় বছরে নানা কারণে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিল্প এলাকার কারখানাগুলোকে নিবিড় পর্যালোচনায় রেখেছে শিল্প পুলিশ। সংস্থাটির হিসাবে, ঈদুল ফিতরের আগে বেতন-বোনাস দিতে সম্ভাব্য অসমর্থ কারখানার সংখ্যা ২৬৬।

জানা গেছে, ঈদকে কেন্দ্র করে শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে শিল্প অধ্যুষিত আট এলাকার কারখানা মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে সভা শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সবগুলো এলাকায় এ সভা অনুষ্ঠিত হবে। শ্রমিকপক্ষের দাবি, ফেব্রুয়ারির পাশাপাশি মার্চের অন্তত অর্ধেক বেতন যেন তারা পায়, সেই সঙ্গে বোনাস। তবে এক্ষেত্রে অন্তত বোনাসটুকু নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীম উদ্দীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত যা সমস্যা আছে, আমরা মনে করছি সেগুলো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। বাকিটা বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও শ্রমিক পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করছি। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, কিছু সমস্যা সৃষ্টির প্রচেষ্টা রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সেগুলো নিষ্ক্রিয় করার পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। আশা করছি বড় কোনো সমস্যা হবে না।’

দেশে শিল্প অধ্যুষিত আট এলাকা আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুমিল্লা ও সিলেটে মোট কারখানার সংখ্যা ৯ হাজার ৭৭৩টি। এর মধ্যে আশুলিয়ায় ১ হাজার ৫৯৫টি কারখানা রয়েছে। এখানে বেতন-বোনাস প্রদানে সম্ভাব্য অসমর্থ কারখানা ৬০টি। গাজীপুরে মোট ২ হাজার ৮০৬টির মধ্যে সম্ভাব্য অসমর্থ কারখানার সংখ্যা ৮২। চট্টগ্রামে শিল্প পুলিশের আওতাভুক্ত কারখানা রয়েছে ১ হাজার ৬৭৬টি। এর মধ্যে সম্ভাব্য অসমর্থ কারখানা ৫৫টি।

নারায়ণগঞ্জে ১ হাজার ৮৮৪টির মধ্যে সম্ভাব্য অসমর্থ কারখানা ২৫টি। ময়মনসিংহে মোট কারখানার সংখ্যা ২৮৯। এর মধ্যে সম্ভাব্য অসমর্থ ৪০টি। খুলনায় মোট ৭৫৮টির মধ্যে সম্ভাব্য অসমর্থ কোনো কারখানা নেই। কুমিল্লায় মোট কারখানার সংখ্যা ৩১৭। সম্ভাব্য অসমর্থ কারখানা চারটি। সিলেটে মোট ৪৪৮টির মধ্যে সম্ভাব্য অসমর্থ কোনো কারখানা নেই।

খাতভিত্তিক বিভাজনের মাধ্যমেও ২৬৬টি কারখানার পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে শিল্প পুলিশ। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্য সম্ভাব্য অসমর্থ কারখানার সংখ্যা ৮৫ এবং বিকেএমইএর ৩৭টি। সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারী বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সদস্য কারখানাগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য অসমর্থ ৩৬টি। বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) আওতাধীন সম্ভাব্য অসমর্থ কারখানা নয়টি। কোনো সংগঠনের আওতায় নেই এমন সম্ভাব্য অসমর্থ কারখানার সংখ্যা ৯৭।

শিল্প পুলিশের পর্যালোচনা অনুযায়ী, শিল্প এলাকাগুলোয় সমস্যাসংকুল কারখানা সবচেয়ে বেশি তৈরি পোশাক খাতের। ২৬৬টির মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের কারখানা ১৭০টি; বাকি ৯৬টি অন্যান্য খাতের। এছাড়া শিল্প পুলিশের আওতাবহির্ভূত ঢাকা মহানগরীর ১০টি কারখানা বেতন-বোনাস দিতে ব্যর্থ হতে পারে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বেতন-বোনাস পরিশোধে অসমর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন বেশকিছু তৈরি পোশাক কারখানা নজরদারিতে রয়েছে। এদের উচ্চ ঝুঁকি, মধ্যম ঝুঁকি ও ঝুঁকিপূর্ণ—এ তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮০টি কারখানায় কর্মরত রয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৯২ জন শ্রমিক। এখানে বেতন-বোনাস পরিশোধ না হওয়া ও শ্রম অসন্তোষ সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। অপেক্ষাকৃত ছোট, মাঝারি ও সাব-কন্ট্রাক্ট কারখানাগুলোয় বেতন-বোনাস দিতে সমস্যা বেশি হতে পারে। ২০ রমজানের মধ্যে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস পরিশোধের দাবিতে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন সোচ্চার হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গতকাল ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ৯৪তম সভা এবং আরএমজিবিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (আরএমজি টিসিসি) ২৩তম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে দেশের সার্বিক শ্রম পরিস্থিতি পর্যালোচনা, আরএমজি খাতে শ্রম অসন্তোষ নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সম্পর্কিত আলোচনা ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কলকারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ ও ছুটি মঞ্জুর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। এছাড়া আরো উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা মাহদী আমিন।

সভায় শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী শ্রমিকদের বকেয়া বেতন সাত কর্মদিবসের মধ্যে এবং ঈদ বোনাস ১২ মার্চের মধ্যে পরিশোধ করতে নির্দেশনা দেন।

আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘মালিক পক্ষ এবং শ্রমিক পক্ষকে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে, যেন জনভোগান্তি সৃষ্টি না হয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘কোনো কারণ ছাড়া লে-অফ ঘোষণা বা শ্রমিক ছাঁটাই করা যাবে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাধারণ ছুটির প্রজ্ঞাপনের পাশাপাশি বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী মালিক ও শ্রমিক পক্ষ পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের ঈদের ছুটি নির্ধারণ করবেন।’

আরও